• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

কবি ও কথাসাহিত্যিক আরিফ মঈনুদ্দীনের বইয়ের ভূমিকায় হুমায়ূন আহমেদ

মাইন সরকার
Update : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

কবি ও কথাসাহিত্যিক আরিফ মঈনুদ্দীনের
বইয়ের ভূমিকায় হুমায়ূন আহমেদ

মাইন সরকার

“পেয়ারী এমনভাবে তার পোশাক পরিবর্তনবিষয়ক কাজ করছে, মনে হচ্ছে তার সামনে স্বামীপ্রবর বসে আছেন। স্বামীর সামনে পোশাক বদলানোতে দোষের কী আছে! চেয়ারম্যান সাহেব অন্তর্বাস পরা পেয়ারীর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।” এখানের পেয়ারী চরিত্রটি অনেক বছর ধরে আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে।

প্রকৃত একজন কথাসাহিত্যিক যে কথার যাদুতে পাঠককে কতটা মোহবিষ্ট করতে পারে তার প্রমাণ তাঁর গল্পের ভেতরই বিদ্যমান থাকে। আলোচ্যমান এই উক্তিটি ‘নোঙরে নিয়তির হাত’ গল্পের। গল্পটি ভাবনায় ফেলার মতো। গল্পটির সমাপ্তি সাধারণের অনেকটা ব্যতিক্রম।

গল্পটিতে আছে চিরন্তন সমাজবাস্তবতা ও নিয়তির এক উজ্জ্বল বিধান, যা পাঠক-হৃদয়ে দোল দিতে সক্ষম। গল্পের পেয়ারী চরিত্রটির সাথে আমরা হাজার বছর ধরে পরিচিত। কিন্তু আরিফ মঈনুদ্দীনের গল্প বলার ধরণ ও কলাকৌশল ‘পেয়ারী’ চরিত্রটিকে চিরনতুনরূপে তুলে এনেছেন।

গল্প পড়তে কার না ভালো লাগে যদি সেটা গল্প হয়ে ওঠে। মূল বিষয়টি হলো হয়ে ওঠা কিংবা না হয়ে ওঠা। ছোটকাল থেকেই সবাই কমবেশি গল্পের সাথে পরিচিত। এ আলোচকও গল্প পড়তে পছন্দ করেন। কিন্তু সব গল্প যে পড়তেই হবে সব সময়ই এ ধারণার বাইরে থেকেছেন তিনি। সেটা ইচ্ছে করেই। যেমন সবাই যখন স্কুল, কলেজে ‘আমি তপু’ অথবা ‘নন্দিত নরকে’ পড়তে পছন্দ করতো ঠিক সেই সময়ে তার পছন্দ ছিল– “যে গল্পের শেষ নেই”।

প্রচণ্ড সমুদ্র বিলাসী এই আলোচককে টানতো– লাইফ অফ পাই, রবিনসন ক্রুশো, ট্রেজার আইল্যান্ড এরকম আরো বেশকিছু বই। স্কুলে পড়ার সময় কাজী নজরুল ইসলামের ৮০ ভাগ বই কিনে পড়ে শেষ করে ফেলেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদকেও পড়েছেন।

তবে হুমায়ূন তার লেখায় যে দুটি বিষয়কে নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন- তা হলো লজিক এবং এন্টি লজিক। হুমায়ূন আহমেদ এর ভ্রমণ কাহিনি – মে ফ্লাওয়ার, হোটেল গ্রোভার ইন, উঠোন পেরিয়ে দুইপা এ আলোচককে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছে। হুমায়ূন পড়ে সবচেয়ে বড় বাস্তব সত্য যে বিষয়টি উপলব্দি করা গেছে, তা হলো তিনি (হুমায়ূন আহমেদ) হলেন বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। যার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক।

একটি বইয়ের মলাটে তিনি লিখে ছিলেন “চাঁদনি পসর রাতে যেন আমার মরণ হয়”। তিনি জীবনকালে চেয়েছিলেন প্রবল জোছনার তোড়ে ভেসে যাওয়া কোনো রাতে যেন তার মৃত্যু হয়। সেই হুমায়ূন আহমেদই এই সময়ের একজন কবি ও কথাসাহিত্যিক আরিফ মঈনুদ্দীনের বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন!

‘নোঙরে নিয়তির হাত’ আরিফ মঈনুদ্দীনেরই অন্য একটি বইয়ের নাম গল্প। হুমায়ূন আহমেদ আরিফ মঈনুদ্দীনের গল্প সংকলনের ভূমিকায় লিখেন– “আরিফ মাঈনুদ্দীনের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন। আমার সৌভাগ্য তিনি আমাকে তাঁর গল্পগুলি আগেই পড়তে দিয়েছিলেন। আমি আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে পড়েছি। আরিফ মঈনুদ্দীনের গদ্য চমৎকার। কাহিনি তৈরির কলাকৌশলও তিনি ভাল জানেন। লেখকের প্রধান যে গুণ– চারপাশের মানুষের প্রতি মমতা, তা তাঁর আছে। কাজেই গদ্যের কঠিন ভূমিতে তাঁর পদচারণা সহজ ও স্বাভাবিক হবারই কথা। তাঁকে অভিনন্দন। তাঁর হাতে সোনার ফসল ফলুক এই শুভকামনা।”

হুমায়ূন আহমেদের প্রশংসা যথাযথ। আরিফ মঈনুদ্দীনের গল্পের ভেতর তড়তড় করে ঢুকে যাওয়া যায়। ‘নোঙরে নিয়তির হাত’ গল্প সংকলন এটার প্রমাণ। এ গ্রন্থে গল্প রয়েছে মোট নয়টি।

যেমন তাঁর প্রথম গল্পটির নাম যেখান থেকে শুরু– “ডাক্তার ইব্রাহিমের মন খারাপ। এটা কোনো ঘটনা না, তার মন সারাবছরই খারাপ। তবে আজকের খারাপটাই ঘটনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আজ সে একটা ভিন্ন রকম ভাবনায় আক্রান্ত। ভাবনার মাঝামাঝি এসে নিজেকে দার্শনিক দার্শনিক লাগছে। কী দরকার ছিল এত টাকার? এক জীবনে কত টাকার প্রয়োজন?

সে তার বাবার কথাই ভাবছে। তার বাবা রহমত আলী ছিলেন মফস্বল শহর ফেনীর একজন নামজাদা উকিল। ওকালতি পেশার মাহাত্ম্য হলো যতবেশি নামডাক ততবেশি টাকা। নামকরা উকিলদের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।”

গল্পগুলো পড়ে আরিফ মঈনুদ্দীনকে কথার যাদুকর বলা যেতেই পারে। কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের গল্পে রয়েছে মানবিকতা, কবি হলেও তাঁর গল্পগুলো খুব উঁচুমানের, কথা সাহিত্যক হিসেবেও তিনি নিজেকে যথেষ্ঠ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আরিফ মঈনুদ্দীনের প্রায় প্রতিটি গল্পের ভেতর গল্প আছে।

‘নোঙরে নিয়তির হাত’ বইটি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় প্রকাশনী ‘অন্যপ্রকাশ’। বইটি সুখপাঠ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category