• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৯ অপরাহ্ন

আমলাতন্ত্রে মন্থর সচিবালয়,মন্ত্রী-এমপিদের তাগাদায়ও নড়ছে না ফাইল- ছয় মাসেও উন্নয়নকাজের নিষ্পত্তি হয়নি

নিজেস্ব প্রতিবেদন
Update : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকারের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র সচিবালয়ে যেন মন্থর হয়ে আছে কাজের গতি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি থাকার পরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল দিনের পর দিন, কোথাও মাসের পর মাস পড়ে থাকছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার টেবিলে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বারবার তাগাদা ও মৌখিক নির্দেশের পরও অনেক ক্ষেত্রে ফাইলের গতি বাড়ছে না। ফলে সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্প—সবখানেই দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মধ্যেও।

সম্প্রতি সচিবালয়ের একাধিক মন্ত্রণালয় ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কর্মকর্তাদের একাংশের নীরব অসহযোগিতা, সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা এবং ফাইল ছাড়তে অযথা সময়ক্ষেপণের অভিযোগও উঠেছে। এতে সরকারের কর্মকাণ্ডে তৈরি হচ্ছে ‘কচ্ছপগতি’। এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মশালার কাঠামোগত পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অতি সম্প্রতি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এমন একটি ঘটনায় মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বিষয়টি সামনে আসে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তাকে কয়েক মাস আগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব যোগদানের ক্লিয়ারেন্স দিতে রাজি না হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে ছিল। পরে বিষয়টি ধর্মমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি তার একান্ত সচিবকে (পিএস) বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও ডেকে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধানের নির্দেশ দেন।

সরেজমিন দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনে বিভিন্ন কাজের জন্য একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে এসেছিলেন কয়েকজন ব্যক্তি। ওই মন্ত্রণালয়ের অধীন অপর একটি দপ্তরের শীর্ষ দুজন কর্মকর্তা এসে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় বলা হয়, ফাইলটি এখনো মন্ত্রীর দপ্তরে যায়নি। বিষয়টি জানার পর প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। সম্ভবত সচিব বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন এবং ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, তবে সেই ব্যাখ্যা প্রতিমন্ত্রীর মনঃপূত হয়নি। একপর্যায়ে তিনি সচিবকে বলেন, কাজ হবে কি হবে না সেটি দ্রুত পরিষ্কার করে বলবেন। অযথা কালক্ষেপণ এবং সেবাপ্রার্থীকে হয়রানি করবেন না। এতে সরকারের কাজে গতি কমে যায়। যদি আপনারা ইচ্ছা করে এসব করেন, তাহলে সরকার বিব্রত হয় এবং কাজের গতি মন্থর হয়ে যায়। খবরদার এ রকম করা যাবে না—বলে ফোন রেখে দেন প্রতিমন্ত্রী।

শুধু এই ঘটনাই নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ফাইল আটকে থাকার নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক ফাইলের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত থাকলেও তা পরবর্তী ধাপে পাঠাতে দিনের পর দিন সময় নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশের পরও ফাইল সচল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের টেলিফোন করে কর্মকর্তাদের তাগাদা দিতে হচ্ছে।

ছয় মাসেও শেষ হয়নি কাজ: সচিবালয়ে আসা জনপ্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতায়ও ফুটে উঠেছে দীর্ঘসূত্রতার চিত্র। খুলনার একটি আসনের প্রভাবশালী একজন সংসদ সদস্য জানান, তার এলাকার একটি জরুরি উন্নয়নকাজের নিষ্পত্তির জন্য তিনি টানা ছয় মাস ধরে সচিবালয়ে যাতায়াত করছেন। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তদবির ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগের পরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কর্মকর্তাদের টালবাহানায় কাজটি শেষ হয়নি।

চাঁদপুরের একটি আসনের এক সংসদ সদস্য বলেন, বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে তিনি নিয়মিত সচিবালয়ে যান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পরও বাস্তবে নিচের স্তরে গিয়ে ফাইল আটকে থাকে। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে থাকে নথি। আমলারা যেন রাজনীতিবিদদের হয়রানির অপেক্ষায় থাকেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। ময়মনসিংহের একটি আসনের একজন সংসদ সদস্যও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে দ্রুত সিদ্ধান্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে সেই গতি আর থাকে না। ফলে একটি ছোট সিদ্ধান্ত নিতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। এতে নির্বাচনি এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে।

জবাবদিহির ঘাটতিই বড় সমস্যা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন দীর্ঘসূত্রতা কমবে না। ফাইল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে প্রশাসনের কাজের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে একটি ফাইলের বিলম্ব পরবর্তী একাধিক ধাপের কাজকে পিছিয়ে দিতে পারে।

তাদের মতে, আমলাতন্ত্রের কাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন। কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা কিংবা অপ্রয়োজনীয় পর্যায়ে ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতি প্রশাসনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও নাগরিক সেবায়।

সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি। কোন ফাইল কোন পর্যায়ে কত দিন পড়ে থাকছে, কেন আটকে আছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেন তা নিষ্পত্তি করছেন না—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘যে অভিযোগ উঠেছে তার সমাধান আপাতদৃষ্টিতে খুবই কঠিন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে সচিবালয়ের কাজের বিষয়ে জেনে মনে হচ্ছে, এটা বদলানোর একমাত্র উপায় হলো আমলাদের মাঝে মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের ট্রেনিং শিডিউলে পরিবর্তন ও মডিউল উন্নত করতে হবে।’

‘আমরা বিপিএটিসি, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, ট্রেনিং একাডেমি এবং আরেকটা নতুন হচ্ছে- জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি (নাডা) ওইখানে যদি আমরা ট্রেনিং মডিউলগুলা ডেভেলপ করতে পারি ও এই নর্মসগুলো ঢোকাতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় যদি এটার ইফেক্ট পড়বে। তা না হলে এক রেজিম যাবে আরেক রেজিম আসবে, কেউ কেউ চেষ্টা করবে যে এই রেজিমকে বিপদে ফেলতে, আর কেউ চেষ্টা করবে তাদের কাছের হতে।’

তিনি আরও বলেন, এটার আরেকটা সমাধান আছে। সেটা হলো আমরা যদি আমাদের সংসদকে শক্তিশালী করতে পারি। এই জাতীয় যত কেস সংসদে আলোচনা করে উদাহরণ হিসেবে যদি শাস্তি দেওয়া যায়, তাহলে মনে হয় মানুষের অনুভূতি ফিরে আসবে। ফলে আমাদের যারা অফিসিয়াল তারাও বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা অনেকেই শুধু আমলাতন্ত্রকে সমানে দোষ দিই, গালাগাল করি। এটা ঠিক না। কারণ আমলাতন্ত্রের এই অবস্থার জন্য কারা দায়ী? যারা আমলাদের এই শীর্ষ পদে বসিয়েছেন। বাছাই তো রাজনীতিবিদরা করেন। তারা যদি ভালো চয়েস না করেন, ভালো, দক্ষ ও যোগ্য আমলা না বসান এর জন্য দায় কাকে দেবেন? রাজনৈতিক আনুকূল্যে আমি যাদের বসাচ্ছি তারা তো অদক্ষ। কারণ যারা সত্যিকার দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং সৎ ও নিরপেক্ষ তারা তো তদবির করবেন না। তাদের তো চাওয়ার কিছু নেই। সুতরাং তাদের না নিয়ে নিজের পছন্দমতো লোক নিচ্ছেন।’

‘আর জনগণ কিছু আমলাকে দেখে সব আমলাতন্ত্রকে খারাপ বলছে। কারণ খারাপগুলো সিনে (দৃশ্যে) আসতেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক আনুকূল্য পেয়ে ভালো আমলাদের সিনে আনছে না। তাদের তো কাজ করতে দিচ্ছেন না। ফলে সরকার যতদিন পর্যন্ত দলীয়করণের ঊর্ধ্বে না উঠতে পারবে, ততদিন সমাধান হবে না।’

মন্ত্রীর কথা সচিবের না শোনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমান নীতিনির্ধারকদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাটা কম। আর এটা তো রাতারাতি হয় না, সময় লাগে। রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে দক্ষ-নিরপেক্ষ আমলাদের যথাস্থানে বসালে তারা জনস্বার্থে কাজ করবেন। এমনকি মন্ত্রী যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যান তখন মন্ত্রীকে বলবেন যে স্যার এটা নিলে এই অবস্থা হবে। এখানে শুধু মেরিট না যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে পদায়ন করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিবাজদের বাদ দিতে হবে।’

সরকারি দপ্তরগুলোতে সহজে ফাইল নড়ে না—এমন অভিযোগ বহু পুরোনো এমনটি স্বীকার করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। কিছুদিন আগে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জানতে চাইলে গতকাল তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আপনার অবজারভেশনটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কেননা, আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে থাকার সময়ই এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছি এবং দেখেছিও। সে সময় আমি নিজে চেষ্টা করে ইনিশিয়েটিভ নিয়ে কিছু কাজও করছিলাম। যাই হোক বিষয়টি এখন তাহলে সরকারের নজরে আনতে হবে।’

সচিবালয়ে কাজের গতি বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটার জন্য মনে হয় সচিবদের সেভাবে ইনস্ট্রাকশন দিতে হবে। যদিও এ বিষয়ে সরকারের ইনস্ট্রাকশন আছেই। সচিবালয়ের নির্দেশিকা আছে। রুলস অব বিজনেস আছে। কে কীভাবে কতদিন ফাইল রাখতে পারবেন বিধান আছে। এগুলো প্রতিপালন না করলে সরকারি আদেশ অমান্য করার অপরাধ বলে গণ্য হবে। সুতরাং সরকার এগুলোকে খুব শক্ত বা কঠিনভাবেই দেখবে। কারণ এটা তো একটা নীতিমালা বা নীতি-বিধানের লঙ্ঘন।’

জনপ্রশাসন সচিব আরও বলেন, আমার বিশ্বাস, সচিবরা অনেক অভিজ্ঞ। তারা তাদের জুরিসডিকশন তার টাইম অনুসারে ফাইলে সই করবেন। আমার মনে হয়, এটাই সরকারের চাওয়া। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে নীতিমালা মেনে সবাই একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে চাই। কোনো কঠিন কথা বলতে চাই না। দরকার হলে সচিবদের ডেকে আবারও একটা মিটিং করা যেতে পারে। কাজের গতি সাধনে নিশ্চয়ই আমরা এগুলো বিবেচনায় রাখব।

চলমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সোমবার সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয় উত্থাপন করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘টাক্সফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা।

একই সঙ্গে সরকারের কাছে কোনো ‘ক্রেডিট’ না চেয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিম দিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গত ১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ ছয় মাসে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবে সংকট সমাধানে সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

চলমান ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ নেই। ভুল নীতি ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাবেও বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের সুস্পষ্ট স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।

বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

আলোচনা প্রস্তাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে শহর ও গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হচ্ছেন। উৎপাদন ও রপ্তানি হ্রাস পাওয়ায় দেশের সার্বিক অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলা, শিল্প-বাণিজ্য রক্ষা এবং বেকারত্ব রোধে সরকারের পদক্ষেপ ও করণীয় নির্ধারণে বিষয়টি সংসদে অবিলম্বে আলোচনার দাবি রাখে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই সংকট মোকাবিলায় মুখের আশ্বাস নয়, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে।

তিনি বলেন, সংসদে মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ ও ভুতুড়ে বিল বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এসব সমস্যা রয়ে গেছে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে যত ভালো পরিকল্পনাই করা হোক, তা ব্যর্থ হবে।

বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে বিরোধী দল। প্রয়োজন হলে বিরোধী দলের টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সরকার কাজে লাগাতে পারে। এখানে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিটের বিষয় নেই। প্রয়োজন হলে সব কৃতিত্ব সরকার নিক, তারা শুধু সংকটের সমাধান চান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। বিগত দিনে গ্যাসের উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যবস্থা আগের সরকারের রেখে যাওয়া। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে নতুন করে যে তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেখানে ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অনুগত টাইকুনদের লালন-পালন করতে গিয়ে বিদেশনির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছিল এবং কোনো প্রকার দেশীয় অনুসন্ধানে নজর দেয়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, দেশে বর্তমানে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দৃশ্যমান, তা পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনারই ফল।

বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পুরোনো চুক্তি রাতারাতি বাতিল করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চুক্তি বাতিল করলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ধৈর্য নিয়ে এগোতে হবে।

তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। এতে প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে ১৮ মাসের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা দিয়ে ৬২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, পায়রায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মাতারবাড়ীতে এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

চলমান ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ নেই। ভুল নীতি ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাবেও বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ও সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। তিনি বলেন, সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের সুস্পষ্ট স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে রামপালের বন্ধ থাকা ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ১০৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির কাজ চলছে। গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই দুটি নতুন এফএসআরইউর চুক্তি এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর বর্তমান সরকারের মেয়াদেই ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ হবে। এতে পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।

মিটার ভাড়া পুরোপুরি মওকুফে ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রুফটপ সোলারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে আগামী বছর পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে সংকট থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণের জন্য দয়া নয়, তাদের অধিকার। জনগণ বিল ও কর দেয়, তাই ঘরে আলো জ্বলা ও চুলায় আগুন থাকা তাদের অধিকার। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও বকেয়া, জ্বালানি সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদকদের কাছে সরকারের বিপুল বকেয়া থাকায় অনেক কেন্দ্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে পারছে না। একই সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।

মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জের নামে ডিজিটাল চাঁদাবাজি চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব চার্জ বন্ধের পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি সেল গঠন, বকেয়া বিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং শিল্পকারখানাকে সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দিতে হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিও বর্তমান সংকটের জন্য আগের সরকারের আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেছেন। তবে শুধু আমদানি করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category