কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা গ্রন্থ
“নিজের ভেতর থেকে উত্থান ”
মাইন সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক
নিজের ভেতর থেকে উত্থান কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের
কবিতাগ্রন্থ। যেখানে অন্তর্গতজগতের নীরব প্রেমময়
উত্থানের দিকে জেগে ওঠেছে কবি। পৃথিবীর যতো
সংকোচ, ভয় আর নীরবতার ভিতর ভেঙে ক্রমে ক্রমে
মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন কবি। এখানে এই যে জেগে ওঠা, এই জেগে উঠার মানে পৃথিবীর গভীরতম অন্ধকারেও নিজের ভেতর নিজেই আলো হয়ে ওঠা,
কিংবা নিজের ভেতর থেকে উত্থান মানে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী ঘোষণা। যেখানে উত্থান মানে চেতনার জাগরণ, স্বত্বার পুনর্গঠন। আবার কখনো কখনো
উত্থান মানে পতন থেকে উঠে দাঁড়ানো। অন্ধকার অতিক্রম করে নতুন শক্তি অর্জন করা। আসলেই পরিবর্তন আসে নিজের ভেতরগত জগৎ থেকে।
তাই বলা চলে কবির এই গ্রন্থটি উত্থানের পথেই
হেঁটে যাবে। কবিতার চিরায়ত বাক বদলের হাওয়ায় আমাদেরকে চিরদিন সত্য ও পতনের পথ ভেঙে
উত্থানের দিকেই পা বাড়াতে হবে।
সন্ধান কবিতাটি
আমি খুঁজতে খুঁজতে পেলাম আমাকে
যেনতেন খোঁজ নয়–
দুর্গম সমুদ্র – তলদেশে আরাধ্য সম্পদ খোঁজার মতন
শ্রমে- ঘামে বপন করা কষ্টের বীজ
পাতালপুরীর রাজকন্যার ঘুম ভাঙানো দুঃসাহসী
রাজপুত্রের ভয়ংকর অভিযান
যে – কোনো মুহূর্তে রাক্ষসের উদরপূর্তির
ভয়াবহ সম্ভাবনাকে নাকচ করে এগিয়ে গেলাম
মাইল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে
ঝড়- জলোচ্ছ্বাস বিক্ষুব্ধ প্রমত্তা
সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়ে খুঁজে পেলাম আমাকে
আমি তার ভেতরে কী নিরুদ্বিগ্ন বসে আছি ভয়ডরহীন
ভেতরের জগৎ তার ছোঁয়ায় আজ হয়েছে রঙিন।
কবি আত্মার স্বরুপ উপলব্ধি করে প্রকৃত সত্তার মুখোমুখি হয়েছেন। এই সত্য ও আধ্যাত্মিক জাগরণে
বদল হয়েছে কবির দেখার চোখ। যেখানে নিজেকে খোঁজার মধ্যে দিয়ে মানুষের যাত্রার সমাপ্তি ঘটে।
আলোচ্য এই কবিতাটির নাম সন্ধান। আর এই সন্ধান করতে গিয়েই কবি নিজেকে পেয়েছেন। মানুষ নিজের গভীরে একাকার হয়ে নিজেকে খোঁজে পায়। আমরা যদি সুফি দর্শনের আলোকে চিন্তা করি —
সুফি দর্শনে মানুষের জীবন হলো ইশ্ কের সফর।
এই ইশ্ কের সফরে দুঃখও সাবলীল হয়ে ওঠে। তাই বলা যেতে পারে সন্ধান নীরব আত্মা ও আলোকিত মানুষের কবিতা।
অব্যথ শব্দস্ত্রের জনক
(বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণেষু)
অনিবার্য এক আলোর মশাল
দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যতটুকু তারচেয়ে বেশি অদৃশ্যের
মিহিন পর্দা কাঁপিয়ে
দ্বিধাহীন ঢুকে গেছে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনে
প্রতিবাদী পৌরুষের দ্রোহী অস্তিত্বে প্রোথিত
এ এক মোক্ষম শব্দস্ত্র — অব্যথ বৈশিষ্ট্যের কাছে সমর্পণ সেরে
মহাদাপটে এগিয়ে যাচ্ছে যুগ থেকে যুগান্তরে
এই কবিতাটি মূলত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্মরণ করে লেখা এক গভীর শ্রদ্ধ্ঘ্য।
কবি আরিফ মঈনুদ্দীন এখানে নজরুলকে একটি
অবিনাশী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এখানে নজরুলের কবিতা যে শুধু অনুভূতি নয় বরং
বুূ্দ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের শক্তি তা স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।
কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের “অব্যথ শব্দাস্ত্রের জনক ”
এই কবিতাটির মূল ভাব হলো ” অব্যথ শব্দাস্ত্র ”
নজরুলের কবিতা ও ভাষা এখানে অস্ত্র, কিন্তু তা রক্তক্ষয়ী নয়; কেবল তার কবিতা ও ভাষা চেতনার স্তরে আঘাত হানে।
কবিতা : সত্যের অভিবাদন
“পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম
এতদূর যে এসেছি — তাও অনেক চড়াই -উতরাই পেরিয়ে
নদী- সাগর সাঁতরিয়ে, অনিয়ম – অবিচারের পাহাড় ডিঙিয়ে
আর বেশিদূর যেতে পারলাম কই– এখানো অনেক পথ বাকি”
এই অভিবাদন মানে শুধু শুভেচ্ছা নয়, সত্যের মুখোমুখি হওয়া। আবার পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎ
থেমে যাওয়া মানে, নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করা।
হে পথিক তুমি কোন পথে যাচ্ছো, কেন যাচ্ছো?
মানব জীবনে দুঃখ অনিবার্য যেনেই পথ চলতে হবে।
আবার এই দুঃখই মানুষকে পরিপক্ব করে তোলে।
লোভ ও মোহ সবসময় মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখে। আত্মার শুদ্ধতা যাপিত জীবনের একটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর সাধনার নাম। এই কবিতার প্রথম অংশটিতে অস্তিত্ববাদ ও দার্শনিক কবিতা। যাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে একজন পাঠকের বহুমাত্রিক চিন্তার দরজা খোলে যাবে।